সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড
বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের একটি সংরক্ষিত স্থান হলো সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড। এর অর্থ হলো, যার কোনো তল নেই। বঙ্গোপসাগরের এই অঞ্চলটির নামকরণের পেছনে রয়েছে একটি রহস্য।
আঠারশো শতকের শেষ দিকে ডুবে যাওয়া একটি বৃটিশ যুদ্ধজাহাজের খোঁজে এসেছিল দেশটির আরো কয়েকটি জাহাজ। এর সঙ্গে ছিল একদল জরিপকারীও। কোনো নিশানা না পেয়েই এর নাম দেয় সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড।
রহস্যময় এ স্থানটি সবার নজরে আসে ২০১৪ সালে। ১ লাখ ৭৩ হাজার ৮০০ হেক্টর এলাকা নিয়ে সংরক্ষিত এলাকাটি গঠিত। সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড সুন্দরবনের দুবলার চর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
গভীরতম এ উপত্যকা রেকর্ড আয়তন প্রায় ১৩৪০ মিটার। এর গড় গভীরতা প্রায় ১২০০ মিটার। এখানকার ডুবো গিরিখাত বঙ্গীয় উপবদ্বীপের অংশ। যা বিশ্বের বৃহত্তম ডুবো গিরিখাত।
ইতিহাসের তথ্য মতে, গঙ্গা -ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত বঙ্গোপসাগরের মধ্যকার এ গভীর খাদটি ‘গঙ্গা খাদ’ নামে পরিচিত। বিশ্বের বড় ১১টি বড় উপত্যকার একটি।
কথিত আছে, এখানেই ১৮৬৩ সালে গ্যাডফ্লাই নামে একটা ২১২ টন ওজন বিশিষ্ট গানবোট ভারত থেকে ইংল্যান্ডে বিপুল পরিমাণ ধনরত্ন নিয়ে যাওয়ার সময় ঝড়ের কবলে পড়ে ডু্বে যায়। তখন সেটির কোনো চিহ্নই পাওয়া যায়নি।
সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মতে, সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড একটি সামুদ্রিক অভয়ারণ্য। স্থানটিকে স্থানীয় জেলেরা বলে নাই বাম। কারণ তারা সাগরে ফুট কিংবা মিটারে হিসাব না করে বাম, দশ বাম, বিশ বাম। আর সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের গভীরতা সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই বলেই, নাই বাম বলে ডাকেন তারা।
প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর খাদ মারিয়ানা ট্রেঞ্চের মতো। বঙ্গোপসাগরের অন্যতম মাছের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে নানা জাতের সামুদ্রিক মাছের পাশাপাশি আছে বিশাল তিমি, ডলফিন, হাঙর, কচ্ছপ আর বিরল প্রজাতির কিছু জলজপ্রাণী। প্রায় দেড় হাজার বর্গমাইলের বিস্তীর্ণ এলাকাটি বিরল জীববৈচিত্রের নিরাপদ প্রজননকেন্দ্র।
এসব সামুদ্রিক প্রাণীর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো তিমি, পপাস ডলফিন, পৃথিবীর বৃহত্তম ইরাবতী ডলফিন, গোলাপি পিঠের কুঁজো ইন্দো প্যাসিফিক ডলফিন ও মসৃন পিঠের (পাখনাহীন) ইমপ্লাইস ডলফিন।
ভ্রমণপিপাসুদের জন্য আকর্ষণীয় এক স্থান হলো সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড। এখানে পানির কাছাকাছি সী-গাল পাখির অবস্থান দেখে বুঝতে পারবেন ডলফিন এবং তিমির অবস্থান। তিমির মধ্যে এখানে দেখতে পাবেন ব্রীড তিমি ও মিল্কি তিমি।
দৈত্যাকার তিমির উপস্থিতি মুহূর্তে শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দিলেও সৃষ্টির এমন রহস্য কাছ থেকে দেখে নিজেকে পরম সৌভাগ্যবানই মনে হবে। এছাড়া সামুদ্রিক রহস্যময় জীব জগতের মধ্যে এখানে দেখতে পাবেন প্রায় ১০ প্রজাতির পাখি, ৩০ প্রজাতির মাছ সহ আরো নানা জাতের প্রাণী।
স্থানীয় জেলেরা এখানে মাছ ধরার সময় অদ্ভুত কিছু ঘটনার কথা বলেছেন। অনেকেই দাবি করেছেন যে তারা এখানে অদৃশ্য সত্তার উপস্থিতি অনুভব করেছেন।স্থানীয় মানুষের মধ্যে এই অঞ্চলের বিভিন্ন কিংবদন্তি ও কাহিনী প্রচলিত আছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে এখানে কিছু অশুভ শক্তি বিরাজমান। তাদের মতে, কিছু সময় তারা অনুভব করেছেন যেন তাদের চারপাশে অদৃশ্য কিছু ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা স্থানীয়দের মধ্যে অনেক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।স্থানটি মাঝে মাঝে অদ্ভুত রঙের জল দেখা দেয়, যা স্থানীয়দের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে।
কিছু বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন যে এটি তলদেশের কিছু উপাদানের কারণে হতে পারে।স্থানীয় মানুষদের মধ্যে এই স্থানের চারপাশে অনেক পুরোনো কাহিনী প্রচলিত আছে, যা স্থানটির রহস্যময়ত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এর মধ্যে রয়েছে দেবদূত, জলদস্যু এবং অন্য অশুভ শক্তির কাহিনী।অনেক লোক বলেন, প্রাচীনকালে এখানে জলদস্যুরা লুকিয়ে ছিল। তারা জাহাজ থেকে ডাকাতি করে চলে যেত। স্থানীয় লোকেরা বিশ্বাস করে যে এখনও তাদের আত্মা এই অঞ্চলে বিরাজমান।কিছু স্থানীয় জনগণের মতে, সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে বিপদের সংকেত হিসেবে অদ্ভুত তীব্র বাতাস বা ঢেউ দেখা দেয়। তারা বিশ্বাস করে যে এটি পূর্বাভাস দেয় যে সেখানে বিপদ আসছে।পুরোনো ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, এই অঞ্চলে কিছু অশুভ শক্তি বিদ্যমান। স্থানীয় মানুষদের মধ্যে এই ধরনের বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে যে যারা সেখানে যাতায়াত করে তাদের জীবনে বিপদ ঘটতে পারে। (২য় পর্ব)


No comments:
Post a Comment